মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০

আধুনিক গানের স্বর্ণালী অতীত

 

শাহনাজ রহমতুল্লাহ বাংলা গানের শাশ্বত এক শিল্পী


একটা সময় ছিল, সময়ের ব্যপ্তিটা খুব ছোট নয়,১৯৪০ থেকে ১৯৯০, পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার মানুষের একমাত্র বিনোদন মাধ্যম ছিল রেডিয়ো । ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর নাজিমউদ্দিন রোডে এখন যেখানে শেখ বোরহানুদ্দিন কলেজ এখানেই ছোট একটা রুমে শুরু হয় ঢাকা রেডিয়োর যাত্রা । ওই সময় অনেকেই কলকাতা থেকে ঢাকার এই স্টুডিওতে তাদের প্রতিভাকে উজাড় করে পূর্ব বাংলার একটা স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা গড়ে তোলার প্রয়াসী হন । অখিলবন্ধু ঘোষ এখানেই তাঁর প্রতিভার যথার্থ স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন । পরবর্তী সময়ে এখানে আরো যোগ দেন আঃ আহাদ,সুখেন্দু চক্রবর্তী,আঃ হালিম চৌধুরী,কাদের জামেরী,সমর দাশ প্রমুখ । এদের মধ্যে আঃ আহাদ ও সমর দাশের পশ্চিম বাংলার বাংলা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল,সুখেন্দু চক্রবর্তী গণসঙ্গীত গাইতেন,চমৎকার আধুনিক ও নজরুল গীতি গাইতেন আঃ হালিম চৌধুরী, কাদের জামেরী ছিলেন একজন পিউর ক্ল্যাসিকেল কম্পোজার,শেখ লুৎফর রহমান গাইতেন গণ সঙ্গীত,পরবর্তী সময়ের প্রখ্যাত নজরুল গীতি শিল্পী সোহরাব হোসেন নাজিমউদ্দিন রোড থেকে আধুনিক গান দিয়ে শুরু করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকে প্রথম দিকে আসেন হুসনা বানু,খানম,লায়লা আর্জুমান্দ বানু,আফসারি খানম,রওশন আরা মাসুদ,মাহবুবা হাসনাৎ(রহমান) প্রমুখ ।

 

 ১৯৫৫ সালে আবু বকর খাঁন,আনোয়ারউদ্দিন খাঁন,আবু হেনা মুস্তাফা কামাল এই বন্ধুত্রয় নাজিমউদ্দিন রোডের রেডিয়ো স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করেন তখন বর্তমান বাংলাদেশী আধুনিক সঙ্গীত এক ভিন্নমাত্রা পায় । একই বছর যোগ দেন ফেরদৌসী রহমান,১৯৫৮ সালে আঞ্জুমান আরা বেগম ও ১৯৫৯ সালে আঃ জব্বার । ফেরদৌসী রহমান ও আঞ্জুমান আরা বেগম তখন সদ্যই কৈশোর অতিক্রম করেছিলেন, আনোয়ার উদ্দিন খাঁন ও আবু হেনা মুস্তাফা কামাল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র ।

১৯৫৫ সাল পর্যন্ত যারা রেডিওতে গাইতেন সংগত কারণেই তাদের কণ্ঠ ও সুরে পশ্চিম বংগের একটা ধাঁচ এসে যেত। আবু বকর খাঁন, আবু হেনা মুস্তাফা কামাল ও আনোয়ার উদ্দিন খাঁন যখন গানের ভুবনে এলেন তখন থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রিক যাকে আমরা পূর্ব বাংলা বলতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতাম এ এলাকার সুর ও গায়কীতে একটা স্বাতন্ত্রবোধ দেখা দেয়। মূলত এদের হাত দিয়েই মূল আধুনিক গানের সূত্রপাত হয়। আবু বকর খাঁন ছিলেন এক ক্ষণজন্মা সুর ও কণ্ঠসাধক। তাঁর কোন গানই দীর্ঘদিন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ওনার গান সংগ্রহের জন্য শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে একটি কমিটিও কাজ করেছিল। অবশেষে এক বিদগ্ধ সংগীত সংগ্রাহকের মাধ্যমে তাঁর ৪ টি গান পাওয়া গেছে। আবু হেনা মুস্তাফা কামাল গান লিখতেন, আনোয়ার উদ্দিন খাঁন গাইতেন, আবু বকর খাঁন সুর করতেন ও গাইতেন। এরা তিনজন পরস্পর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। আনোয়ার উদ্দিন খাঁন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ও আবু হেনা মুস্তাফা কামাল বাংলায় পড়তেন। তাঁরা তিনজন তখন রেডিও ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্টেজ শো করতেন। আরো তিনজন গায়কের নাম উল্লেখ্য, আসফ উদ্দৌলা, কাজী আনোয়ার হোসেন ও আলতাফ হোসেন। আঞ্জুমান আরা বেগম, ফেরদৌসী রহমান ও ফরিদা ইয়াসমিনও তখন রেডিওতে নিয়মিত গান করছেন।

১৯৫৬ সালে ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ মুক্তি পায়। ঢাকার প্লেব্যাকের সূচনা তখন থেকেই। তবে মুখ ও মুখোশের সব গানই ছিল ফোক। গেয়েছিলেন আ: আলীম ও মাহবুবা রহমান। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত ঢাকার সিনেমায় ফোক ধারার গানেরই প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
ততদিনে লন্ডন থেকে খান আতাউর রহমান ঢাকায় এসে গেছেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও সংগীতে সব্যসাচীর ভূমিকায় অবতীর্ন হন তিনি।

ফেরদৌসী রহমানের


১৯৬০ সালে রেডিও স্টেশন নাজিমউদ্দিন রোড থেকে শাহবাগে স্থানান্তরিত হয়। একই সালে রেডিওর অডিশনে পাস করে সংগীতের ভূবনে পা রাখেন এক অসামান্য গায়ক মো: আলী সিদ্দিকী, তিনি কনভার্টেড মুসলিম, আগের নাম প্রদীপ কুমার সিনহা, বাড়ি ময়মনসিংহের শেরপুরে, বাংলাদেশের একমাত্র গারো সঙস্টার। ১৯৬১ সালের ২ জানুয়ারি একই দিনে রেডিওর অডিশনে পাস করেন খন্দকার ফারুক আহমেদ ও সৈয়দ আ: হাদী, ১৯৬২ সালে আসলেন মাহমুদুন্নবী, গানের জন্য যিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে করাচি চলে গিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে রবিন ঘোষ সুরারোপিত ও এহতেশাম পরিচালিত নতুন সুর ছবিতে একই সাথে প্লেব্যাক অভিষেক হয় বাংলাদেশের তিন সংগীত নক্ষত্রের - মো: আ: জব্বার, শাহনাজ বেগম ও সাবিনা ইয়াসমিনের। ফেরদৌসী রহমানের লিড ভয়েসে একটি শিশুতোষ গানে কণ্ঠ দেন শাহনাজ বেগম ও সাবিনা ইয়াসমিন। আ: জব্বার একটি ডুয়েটে কণ্ঠ দেন ফেরদৌসী রহমানের সাথে। আ: জব্বারের বয়স তখন২৪, শাহনাজ বেগম ও সাবিনা ইয়াসমিন দুজনেরই ১১।

(সঙ্গীত পিপাসুরা চাইলে লেখাটা ধারাবাহিকভাবে চলবে)




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আধুনিক গানের স্বর্ণালী দিন এর নেপথ্যের কারিগর

  পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাট দশকের সূচনা পর্যন্ত রেডিওর গানগুলোতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল মেলোডির উপস্থাপনা করেন। সুরকার ও গায়ক হিসেবে আব...