পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাট দশকের সূচনা পর্যন্ত রেডিওর গানগুলোতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল মেলোডির উপস্থাপনা করেন। সুরকার ও গায়ক হিসেবে আবু বকর খান ও আনোয়ার উদ্দিন খান তো ছিলেন যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। " পথে যেতে দেখি আমি যারে", " সেই চম্পা নদীরও তীরে" এ গানগুলো এই ত্রয়ীর সাধনার ফসল। তবে সিনেমার প্লেব্যাকে রোম্যান্টিক মেলোডির সূচনা হয় আরো খানিকটা পর।
১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত ঢাকাতে যেসব ছবি হয়েছিল যেমন, মুখ ও মুখোশ, আকাশ আর মাটি, মাটির পাহাড়, আসিয়া, এ দেশ তোমার আমার প্রভৃতি ছবির গানগুলো ছিল বেশির ভাগ ফোক অথবা ফোক ফিউশন। এহতেশামের" রাজধানীর বুকে" ছবিটি ছিল প্রথম ছবি যেখান থেকে প্লেব্যাকে পিউর মেলোডির সূচনা হয়। নেপথ্যে ছিলেন গীতিকিবি কে,জি মোস্তফা, আজিজুর রহমান, সাঈদ সিদ্দিকী সুরকার হিসেবে রবিন ঘোষ ও ফেরদৌসী রহমান, শিল্পী হিসেবে তালাত মাহমুদ, ফরিদা ইয়াসমিন ও ফেরদৌসী রহমান।
বিশেষতই কে, জি মোস্তফার লেখা ও রবিন ঘোষের সুরে তালাত মাহমুদের কণ্ঠের সেই অবিস্মরণীয় গান, " তোমারে লেগেছে এত যে ভাল চাঁদ বুঝি তা জানে" গানটি বাংলাদেশি প্লেব্যাকের ইতিহাসে রোম্যান্টিক, পিউর মেলোডির যে অগ্রযাত্রার সূচনা করে তা অব্যহত ছিল আশির দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। একজন অসামান্য গীতিকবি হিসেবে কে, জি মোস্তফা পরবর্তী সময়ে আরো গান লিখেন নতুন সুর, নাচের পুতুল, মায়ার সংসার সহ আরো বেশ কিছু ছবিতে এবং রেডিওর জন্য তিনি বেশ কিছু গান রচনা করেন।
গানের সংখ্যার চেয়ে মানের দিক বিবেচনায় তাঁর লেখা বেশিরভাগ গান কালোত্তীর্ণ। রবিন ঘোষের সাথে তাঁর রসায়নটা ছিল জমজমাট। " আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন/ কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে", মাহমুদুন্নবীর গাওয়া এই চির আবেদনময় গানটিও এই জুটির একটি নতুন অনবদ্য সৃষ্টি।
সিনেমার গান জনপ্রিয় হলে হাইলাইটেড হন নায়ক নায়িকা অভিনেতা অভিনেত্রীবৃন্দ। দর্শকেরা বড়জোর খোঁজ করেন শিল্পী ও সুরকারকে। গীতিকার ও যন্ত্রীরা আড়ালে থেকে যান। কে, জি মোস্তফা ছাড়াও পিউর মেলোডির প্রাথমিক পর্বে আরো ছিলেন আজিজুর রহমান, মোঃ মহসিন, আ,ন, ম বজলুর রশীদ, খান আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, কাজী আজিজ আহমেদ প্রমুখ। জহির রায়হান যে একজন ভাল মানের গীতিকার ও ছিলেন সে বিষয়টি অনেকের অজানা। তিনি কখনো আসেনি, বেহুলা, টাকা আনা পাই,দর্পচূর্ণ যোগ বিয়োগ প্রভৃতি ছবিতে গান লিখেন
১৯৬৫ সালের পর গীত রচনার ভুবনে যুক্ত হয় আরো কিছু উজ্জ্বল নাম, ডঃ মোঃ মনিরুজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মাসুদ করিম, আহমেদ জামান চৌধুরী। আধুনিক গানের পৃষ্ঠপোষকতায় রেডিওর ভূমিকা বরাবরই ছিল অগ্রগামী। শুধুমাত্রই এ মাধ্যমের জন্য ওই সময়ে গান লিখতেন জেব উন নেসা জামাল, শহিদুল ইসলাম, ফজল- এ- খোদা, সিরাজুল ইসলাম, নঈম গওহর, এস এম হেদায়েত।
গীতিকবি মোঃ রফিকুজ্জানের গান লেখা শুরু ওই সময়েই। আর যারা সিনেমায় লিখতেন তাঁরা রেডিও, টিভির জন্যও লিখতেন। আবার শহিদুল ইসলাম, ফজল- এ- খোদা, এস, এম হেদায়েত অল্প কিছু ছবির জন্য গান লিখেছেন। সিনেমায় জীবনের প্রথম গানেই দর্শক/ শ্রোতাদের চমকে দিয়েছিলেন ডঃ মোঃ মনিরুজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, এস,এম হেদায়েত ও শহিদুল ইসলাম। ১৯৬৭ সালে সত্য সাহার সুরে ও খন্দকার ফারুক আহমেদের কণ্ঠে ডঃ মোঃ মনিরুজ্জামানের লেখা, " রিক্ত হাতে যারে ফিরায়ে দিলে ওগো বন্ধু" পুরো সিনেমার ইতিহাসেই একটি শ্রেষ্ঠতম ট্র্যাজিক এপ্রোচ।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার আয়না ও অবশিষ্ট ছবিতে যখন তাঁর প্রথম গান, " আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল/ বাতাসের আছে কিছু গন্ধ" লেখেন তখন তাঁর বয়স ২৩। একজন ২৩ বছর বয়সের যুবকের হাত দিয়ে যে এমন ম্যাচিওর্ড লিরিক্স বের হতে পারে তা ছিল বিস্ময়কর। একই কথা প্রযোজ্য আহমেদ জামান চৌধুরী, শহিদুল ইসলাম ও এস,এম, হেদায়েতের বেলাতেও। ১৯৬৯ সালে আলী হোসেনের সুরে নতুন নামে ডাকো ছবিতে পাকিস্তানের প্রখ্যাত গায়ক আহমেদ রুশদীর কণ্ঠে তুলে দিলেন একটি স্লো রিদমিক ফ্লো, " কে তুমি এলে গো আমার এই জীবনে" প্রায় একই সুরে পাকিস্তানি গায়িকা নাহিদ নিয়াজীর কণ্ঠে " নতুনও নামে ডাকো আমায় এইতো ছিল কামনা", এস, এম হেদায়েত ওস্তাদ ওমর ফারুকের সুরে " ঘুর্ণিঝড় " ছবিতে মোঃ আঃজব্বারের কণ্ঠে তুলে দিয়েছিলেন," একটি মনের আশিস তুমি কাছে যখন এলে" এ গানের আবেদন আজো ফুরায়নি।
রেডিওকে বাদ দিয়ে সংগীতের কোনো ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে না। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শুধু রেডিওকেই সময় দিয়ে গেছেন যারা অজান্তেই তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় ঢুকে গেছে। সুরকার হিসেবে আঃ আহাদ, আঃ হালিম চৌধুরী, কাদের জামেরী, সুখেন্দু চক্রবর্তী, মীর কাসিম খান, রাজা হোসেন খান, দেবু ভট্টাচার্য প্রমুখের নাম করা যেতে পারে। এদের মধ্যে দেবু ভট্টাচার্য বেশ কিছু উর্দু ছবির ও অল্প সংখ্যক বাংলা ছবির মিউজিক ডিরেকশন দিয়েছেন, রাজা হোসেন খানও তাই।
দু একটি করে ছবি করেছেন আঃ আহাদ, কাদের জামেরী ও আঃ হালিম চৌধুরী। আসলে শওকত হায়াত খান, জিনাত রেহানা, হাসিনা মমতাজ, এম,এ হামিদ, দিলারা আলো, রোকেয়া সিদ্দিকা, মীনা বশির, রেবেকা সুলতানা, নজমুল হুদাদের মতো কণ্ঠশিল্পী যদি রেডিওকে শক্ত হাতে না ধরতেন তাহলে মাধ্যমটির প্রাথমিক উত্থান ঘটতো না। সত্যিকার অর্থেই এ সকল শিল্পী বৃন্দ ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। যথেষ্ট সুযোগ ও যোগ্যতা থাকা সত্বেও শওকত হায়াত খান ও এম,এ হামিদ প্লেব্যাকে নিয়মিত হননি। রেডিও ছিল তাদের প্রথম ভালবাসা।
মোমের আলো ছবির একটি চির আবেদনময়ী গান, " ফেলে আসা দিনগুলো স্মৃতি হয়ে রয়" গেয়েছিলেন হাসিনা মমতাজ। এমন একটি গানের পর ওনার বেশ সুযোগ ছিল কিন্তু গান যেহেতু ছিল তাদের ভালবাসা মনে প্রাণে ছিলেন অপেশাদার তাই তাঁরা আঁকড়ে ছিলেন রেডিওকেই।
উল্লেখ্য মোঃ রফিকুজ্জামান ষাটের দশক থেকেই গান লেখা শুরু করেন। তাঁর লেখা গান, " মুগ্ধ আমার এ চোখ" ফেরদৌসী রহমান ও সৈয়দ আঃ হাদী দুজনই গেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে খন্দকার নুরুল আলমের সাথে তাঁর জুটি হলেও উল্লিখিত গানটির সুরকার ছিলেন আজাদ রহমান।
নায়ক নায়িকার মতো গীতিকার সুরকারদেরও অলিখিত জুটি প্রথা ছিল। যেমন জেব উন নেসা জামাল - আজাদ রহমান, মাসুদ করিম - সুবল দাস, ডঃ মনিরুজ্জামান - আলী হোসেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার - সত্য সাহা- সুবল দাস - আনোয়ার পারভেজ। একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন মাহমুদুন্নবী, খান আতাউর রহমান ও আনোয়ার উদ্দিন খাঁন। সাদা কালো চোরাবালি ছবির সবগুলো গান লিখেছিলেন কাজী লতিফা হক। তিনি মহিলাদের সচিত্র বেগম পত্রিকার নিয়মিত লেখিকা।
( ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি তৈরি করতে প্রত্যক্ষ্য সহযোগিতা করছেন সোনালি যুগের কণ্ঠশিল্পী শওকত হায়াত খান, খুরশিদ আলম, বিদগ্ধ সংগীত সংগ্রাহক আরশাদ আলী, মোঃ আতিক ও আমির হোসেন শাহীন)




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন