শনিবার, নভেম্বর ২১, ২০২০

চির স্মরণীয় গীতিকবি মাসুদ করিম

 

মাসুদ_করিম_বাংলাদেশী_গীতিকার

যখন রেডিও ছিল বাঙালির একমাত্র বিনোদন মাধ্যম, মাসুদ করিম ছিল শ্রোতামহলে একটি প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত নাম। ষাট দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত কিছু বছর রেডিও শ্রোতা ছিলেন অথচ মাসুদ করিমের নাম শোনেননি তাহলে তাকে মনোযোগী শ্রোতা বলা যাবে না। ষাট দশকের শুরু থেকেই তিনি বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার ছিলেন। পরে তাঁর লেখার জাদুতে সমৃদ্ধ হয়েছিল আমাদের চলচ্চিত্র জগত।

   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার স্নাতকোত্তর মাসুদ করিম বরাবর চাকুরী করেছেন বেতারে মাঝখানে কিছুদিন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শ্রদ্ধেয় গীতিকবি মাসুদ করিমের অস্থিমজ্জায় মিশে ছিল গীতি ছন্দ। তাঁর লিরিক্স অনুসরণ করলেই বোঝা যায় কথার গাঁথুনী কত শক্তিশালী, ভাবের প্রকাশ কত গভীর, কতোটা সুবিন্যাস্ত শব্দের বুনন। নিচের ৩টি গান উল্লেখ করা হলো যার প্রথমটিতে সন্ধ্যার মায়াবী হাতছানি ও পরের দুটিতে রাতের নিরবতা বাঙময় হয়ে ওঠে, নির্জনতার শব্দমালা কত অপরুপ হয়ে সুরের রিনিঝিনি তোলেঃ

১। ওই আকাশ ঘিরে সন্ধ্যা নামে রাতের আভাসে

কথা ছিল থাকবে পাশে আমার হয়ে সে( শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সুর- রাজা হোসেন খান)

২। একটি রজনীগন্ধা বাতাসে গন্ধ ঢেলে

আজ রাতে আমায় করেছে উন্মন

জানালার পাশটিতে দাঁড়িয়ে আছি

যেন তার পদধ্বনি শুনেছে এ মন( আঞ্জুমান আরা বেগম, সুর- সুবল দাস)

৩। এসো কিছুটা সময় রেখে যাই

ঝিনুকে মুক্তো ভরে

এসো আরো কিছু গানে দিয়ে যাই এই

তীরেরও হৃদয় ভরে

শেষোক্ত গানটির ১ম অন্তরার পর এক ঝলক আবৃত্তি শ্রোতাদের আনমনা করে তোলেঃ

"অনেক গোধুলি থেমে গেছে হেথা

যেতে যেতে এই পথে

অনেক জ্যোছনা স্মৃতি রেখে গেছে

রাত্রির লিপিকাতে

একজন গীতিকবির কথা ও ভাবের প্রবাহের যে সম্যক জ্ঞান থাকা দরকার তা পরিপূর্ণ মাত্রায় ছিল মাসুদ করিমের মধ্যে। শব্দের বুননে তিনি ছিলেন যথাযথ যত্নশীল। নিচের গানগুলো রেডিওর বেসিক গান যেগুলো একবার শুনলে তার আবেশ থেকে যাবে স্মরণের শেষ সীমা পর্যন্তঃ

১। তন্দ্রাহারা নয়ন আমার এই মাধবী রাতে( হাসিনা মমতাজ, সুর- সমর দাস)

২। বাতাসে তোমার সংলাপ শুনে( মাহমুদুন্নবী, সুর- খন্দকার নুরুল আলম)

৩। সংগীতা যদি ডাকি( মাহমুদুন্নবী)

৪। দুটি চোখে চোখ রেখে( ফেরদৌসী রহমান, সুর- আঃ আহাদ)

৫। বাসন্তিকা হয়তোবা তার নাম( এম,এ হামিদ, সুর- ধীর আলী)

৬। আমি যারে ভালবাসি সে আমার নাইবা হলো ( দিলারা আলো, সুর- কাদের জামেরী)

৭। ভীরু ভীরু লজ্জায় রাঙা ওই মুখ( বশির আহমেদ, সুর- কাদের জামেরী)

৮। মন তো নয় আর আয়না( ফওজিয়া খান)

৯।তুমি কি আমার কথা ভাবো( মাহমুদুন্নবী)

১০। তুমি সন্ধ্যাকাশের তারার মতো( সাইফুল ইসলাম, সুর- সমর দাস)

১১। কিছু বলো কিছু বলো(সৈয়দ আঃ হাদী)

১২। সব কিছু মোর উজাড় করে( সৈয়দ আঃ হাদী)

১৩।পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোনো নতুন জ্বালাতন ( আনোয়ার উদ্দিন খাঁন)

মাসুদ করিমের লেখা সোনামণি দের ঘুম পাড়ানি গান( Lullaby)

১। ছোট্ট খোকা ঘুমিয়ে পড় রাক্ষসীরা বেজায় বড়( দিলারা আলো)

২। গল্প যদি শুনতে চাও( অপরিচিতা ছবিতে ইসমত আরার কণ্ঠে, সুর- সত্য সাহা)

রুনা লায়লার গাওয়া নিচের গানটির কথা ও সুরে আছে হালকা ফোক টাচঃ

" আমিতো সুজন দেখে ভাব করেছি"( সুর- খন্দকার নুরুল আলম)

তাঁর লেখা নিচের গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী মেহেদী হাসান

" তুমি যে আমার ভালবাসা"

মাসুদ করিমের মতো মেধাবী ও জনপ্রিয় গীতিকার চলচ্চিত্রে গান লিখবেন না তাতো হতে পারে না। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি চলচ্চিত্রে গান লেখা শুরু করেন তবে তিনি ঢালাওভাবে এ মাধ্যমে গান লেখেননি, বেছে বেছে স্বকীয়তা বজায় রেখে লিখেছেন। রুপবান, অপরিচিতা, অনির্বাণ, মধুমিলন, অনুরাগ, পুত্রবধূ, ভাঙাগড়া, গৃহলক্ষী, রজনীগন্ধা, প্রায়শ্চিত্ত, আগমন, ওয়াদা, ভালো মানুষ, মহানায়ক, গায়ের ছেলে, তানসেন, শিল্পী সহ প্রায় একশত ছবির জন্য গান লিখেছেন মাসুদ করিম। তিনি অচেনা অতিথি ও লালু ভুলু ছবির সব গান লিখেছেন। ছায়াছবির গান রচনায় তিনি বৈচিত্র্যময় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর লেখা নিচের গানগুলো কালোত্তীর্ণঃ

১। আঁধারে আলো হয়ে তুমি যে কাছে এলে( শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও বশির আহমেদ, মধু মিলন)

২। শত্রু তুমি বন্ধু তুমি( আঃ জব্বার, অনুরাগ)

৩। আধখানা চাঁদ আকাশে আধখানা মোর পাশে( সাবিনা ইয়াসমিন, ভাঙাগড়া)

৪। সন্ধ্যারও ছায়া নামে( সাবিনা ইয়াসমিন, পুত্রবধূ)

৫। আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো( সাবিনা ইয়াসমিন, রজনীগন্ধা)

৬। দোস্তি যদি চাও এসো( খুরশিদ আলম, লালু ভুলু)

৭। এক যে ছিল রাজার কুমার ( খুরশিদ আলম, লালু ভুলু)

৮। তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছো মানুষ কিনা( খুরশিদ আলম, লালু ভুলু)

৯। যে কথা নীরবে ভাষা খোঁজে ( সাবিনা ইয়াসমিন, ভালো মানুষ)

১০। তুমি আমি দুজনাতে চলো না যাই একসাথে ( দিলারা আলো ও রুনা লায়লা, ওয়াদা)

১১। যদি বউ সাজো গো( খুরশিদ আলম ও রুনা লায়লা, ওয়াদা)

১২। চলতে পথে দেখা হয়েছে( সাবিনা ইয়াসমিন, অচেনা অতিথি)

১৩। কিছু বলতে ইচ্ছে করে( সাবিনা ইয়াসমিন, গায়ের ছেলে)

১৪। সুরের আগুনে পুড়ে আমার হৃদয় সোনা হলো ( সাবিনা ইয়াসমিন ও আঃ জব্বার, পুত্রবধূ)

১৫। ওই ভীরু মন আমার মনে( কাদেরী কিবরিয়া ও নার্গিস পারভীন, ভালো মানুষ)

১৬। জীবন আঁধারে পেয়েছি তোমারে( সলো রুনা লায়লা, ডুয়েট সাবিনা ইয়াসমিন ও আঃ জব্বার, পুত্রবধূ)

১৭। ভালবাসার স্বপ্নে ঘেরা এইতো আমার ঘর( রুনা লায়লা, গৃহলক্ষ্মী)

১৮। যখন থামবে কোলাহল ঘুমে নিঝুম চারিদিক( রুনা লায়লা)

১৯। শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো ( রুনা লায়লা)

২০। চলে যায় যদি কেউ( সৈয়দ আঃ হাদী, ভাঙাগড়া)

২১। সজনী গো ভালবেসে এত জ্বালা কেন বলো না( বশির আহমেদ, ভাঙাগড়া)

যে গীতিকবিকে নিয়ে বই লেখা যায় তাঁকে স্বল্প পরিসরে উপস্থাপন করা অসম্ভব। বাংলাদেশি সাংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশই হলেন মাসুদ করিম।

মাসুদ করিম ১৯৬৫ সালে বিয়ে করেন দিলারা আলোকে। দিলারা আলো রেডিও ও টিভির আধুনিক গানের এক সুপরিচিত গায়িকা তবে তাঁর প্রতিভার ২০ শতাংশও প্রকাশিত হয়নি। তিনি গান করেছেন ওয়াদা ও ঘরনী ছবিতে।সংসার, স্বামী, সন্তানদের গড়ে তুলতে নিজেকে অনেকটাই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এ মুহুর্তে আমার বড় আপা দিলারা আলোকে। শ্রদ্ধেয়া দিলারা আলো আমাকে ছোট ভাইয়ের সম্মান দিয়েছেন যা আমার এক বড় প্রাপ্তি। ইউটিউবে দিলারা আলোর বেশ কিছু গান আছে, শুনলে বোঝা যাবে তাঁর কণ্ঠের ঐশ্বর্য ও সুরের উপর নিয়ন্ত্রণ।

প্রতি বছর দিলারা আপাকে " মাসুদ করিম সম্মামনা" আয়োজন করতে হয় যা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে কারণ মাসুদ করিমের মতো একজন বহুল জনপ্রিয় ও অসাধারণ গীতিকবির স্মরণ অনুষ্ঠান জাতীয় পর্যায়ে হওয়া উচিৎ।

আজ কিছু নিউজ পোর্টালে মাসুদ করিমের গানের সংখ্যা সহস্রাধিক উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের জ্ঞাতার্থে জানানো হচ্ছে যে জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন সর্বাধিক গানের রচয়িতা। বাংলাদেশের ৩ জন গীতিকারের গানের সংখ্যা সর্বোচ্চ। এরা হলেন মাসুদ করিম, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও আঃ হাই আল হাদী। এদের কারোরই গানের সংখ্যা বিশ হাজারের কম নয়।

আজ কিংবদন্তী গীতিকার মাসুদ করিমের ২৪ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর দুরারোগ্য ক্যান্সারের কাছে হার মেনে ৬০ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি কানাডার মন্ট্রিলের এক কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আধুনিক গানের স্বর্ণালী দিন এর নেপথ্যের কারিগর

  পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাট দশকের সূচনা পর্যন্ত রেডিওর গানগুলোতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল মেলোডির উপস্থাপনা করেন। সুরকার ও গায়ক হিসেবে আব...