আজ আমি ফোন করলাম দেশীয় প্লেব্যাকের সবচে স্বার্থক গায়ক, একুশে পদকপ্রাপ্ত কণ্ঠশিল্পী, আমার বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু ও সুহৃদ মোঃ খুরশীদ আলমকে। মাঝখানের পঁচিশ বছরের বিচ্ছেদের পর ওনার সাথে আমার পুনঃ যোগাযোগ হয় পাঁচ বছর আগে। আমি যতবার ওনাকে ফোন করি তার দ্বিগুণ বেশি সময় তিনিই আমার খোঁজ নেন। টানা ত্রিশ বছর ফিল্মের গান যে গায়ককে ছাড়া হয়নি তিনি অনেক সময় টিভি চ্যানেল থেকেও এই অধমকে ফোন করেন। হালের অজ্ঞ মিডিয়া খুরশীদ আলমকে এক চুমকী দিয়ে ব্র্যান্ড করে ফেললেও মোঃ খুরশীদ আলম রেডিও, টিভি ও ফিল্মে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গান গেয়েছেন আট সহস্রাধিক। এর মধ্যে তাঁর ফিল্মের গানের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি।
তিনি শুরু করেছিলেন রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব সরকার
রবীন্দ্রসংগীত ব্যান্ড করলে খ্যাতিমান সুরকার সমর দাস ও কিংবদন্তী শিল্পী খন্দকার
ফারুক আহমেদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে রেডিওর অডিশনে
পাস করেন। ১৯৬৯ সালে আগন্তুক ছবির সিরিয়াস প্রেজেন্টেশন" বন্দী পাখির মত মনটা
কেঁদে মরে" শুনে শ্রোতাদের মনে হয়নি তিনি চটুল গানের প্রয়োজনীয় শিল্পী হয়ে
উঠবেন। সেই আগন্তুক ছবি ছিল সংগীত পরিচালক আজাদ রহমানের প্রথম ছবি। সেই যে আজাদ রহমানের
হাতটি তিনি ধরলেন গুরু, বাবা, ভাই,
বন্ধু হিসেবে সেই হাতটি তাঁকে ছেড়ে দিতে হল মে,১৬,২০২০
এ আজাদ রহমানের পৃথিবী ছেড়ে যাবার লগ্নে। এখানেই আমরা খুরশীদ ভাইয়ের জন্য চিন্তিত।
শিল্পী খুরশীদ আলমের চেয়ে মানুষ খুরশীদ আলম অনেক বড় মাপের। সংগীত জগতের কেউ অসুস্থ
হলে, মৃত্যুবরণ করলে খুরশীদ আলমকে কেউ বেঁধেও
রাখতে পারেন না। অসুস্থ শিল্পীদের হসপিটালাইজড করতে উপর মহলে তদবির করা, নিজে
উপস্থিত থেকে রোগীর দেখাশুনা করা, দুস্থ শিল্পীদের আর্থিক
সহযোগিতার ব্যবস্থা করা, শিল্পী মৃত্যুবরণ করলে দাফন
কাফনের ব্যবস্থা করাসহ যাবতীয় কাজের মধ্যে তিনি উপস্থিত থাকেন। গত পঞ্চাশ বছরে কোন
শিল্পী অসুস্থ হয়েছেন অথচ খুরশীদ আলম দেখতে যাননি, কোন
শিল্পী মৃত্যুবরণ করেছেন আর খুরশীদ আলম জানাজা দাফনে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন না
এমনটি হয়নি। কোন শিল্পীর মৃত্যু সংবাদটি তাঁর মাধ্যমেই মিডিয়াতে পৌছে। এন্ড্রু
কিশোর সিংগাপুরে চিকিৎসাকালীন সবাই ওনার কাছ থেকেই আপডেট জেনেছেন।বিদেশে অবস্থানরত
কোন শিল্পী কেমন আছেন খুরশীদ আলমের চেয়ে বেশি কেউ জানেন না।করোনাকালে এই ৭৪ বছর
বয়সেও ঘর তাকে আটকাতে পারেনি। রুনা লায়লা একদিন ফোন করে বলেন," খুরশীদ
ভাই, বয়স হয়েছে আর করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ,
একটু সাবধানে থাকবেন।" তিনি মুখে বলেন ঠিক আছে কিন্তু শিল্পী
কেউ অসুস্থ হলে, মারা গেলে ওনার কোন কিছুই মনে থাকে না।
আমার কিছু প্রিয় গানঃ
বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে
শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলেছি
তোমার দু হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম
চঞ্চল দু নয়নে বল না কি খুঁজছ
আলতো পায়ে ছন্দ তুলে
ছবি যেন শুধু ছবি নয়
তোমার নামে শপথ নিলাম
পাখির বাসার মত দুটি চোখ তোমার(রুনা
লায়লার সাথে)
ঝলক দেয়া কাঁকন পরে এসো না আর
এ আকাশকে স্বাক্ষী রেখে
দোস্তি যদি চাও এস
বাপের চোখের মণি নয়
তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছ মানুষ কিনা
আমি কি গাইবে গান
শোন আমার ফরিয়াদ
জন্মদিনে বলতে এলাম
আজকে না হয় ভালবাস
মাগো মা ওগো মা
দুনিয়ারে বলে দে রে
ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি( সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে)
তাঁর জনপ্রিয়, কালজয়ী গান অজস্র। একজন
শিল্পদরদী খুরশীদ আলম আজো আমাদের মাঝে আছেন তাতে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, আমাদের
স্বস্তি।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন