৭৬ বছর কি আজাদ রহমানদের মত কীর্তিমান পুরুষদের জন্য খুব বেশি বয়স? মোটেই নয় । তবে আল্লাহর ডাকে তো সাড়া না দিয়ে উপায় নেই । দেশীয় আধুনিক গানের হিরণ্ময় সময়ের সর্বশেষ খসে পড়া তারকার নাম আজাদ রহমান ।১৬মে,২০২০ খ্রিঃ বাংলা গানের সুরের জাদুকর রাজধানীর শ্যামলী বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহী রাজিউন)১৯৪৬ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে । ৬৪র দিকে তিনি যখন সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন তখন তরুণ বয়সেই তিনি খেয়াল,ঠুমরী,টপ্পায় কণ্ঠ সেধে এসেছেন,ফিরোজা বেগমদের সাথে নজরুল সঙ্গীত শিখেছেন,রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন এমন কি পশ্চিম বাংলার একটি ছবি 'প্রিয়ংবদা'র মিউজিক কম্পোজিশনও করেছেন যে ছবিতে গান গেয়েছিলেন প্রতীমা বন্দোপাধ্যায়, আরতী মুখোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মত প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পীবৃন্দ । করাচি ও কলকাতার প্রভাবমুক্ত একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতির বিনির্মানে আজাদ রহমান শামিল হলেন খুব জোরালোভাবে । শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম প্রাণপুরুষ আজাদ রহমান পুরো সঙ্গীত জীবনেই খেয়াল, ঠুমরীর পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন । ভাবলে অবাক হতে হয় রেডিওর আধুনিক গান ও ছায়াছবির গানেও তিনি কি অসাধারণ বৈচিত্রের পরিচয় দিয়েছেন ।
নিচের কয়েকটি গান রেডিয়োতে আজাদ রহমানের
সুরারোপিত প্রথম দিককার গানঃ
১।মুগ্ধ আমার এ চোখ দুটো,নুগ্ধ
আমার এ মন( মোঃ রফিকুজ্জামানের লেখা রেডিওর প্রথম গান, ফেরদৌসী
রহমান ও সৈয়দ আঃ হাদী দুজনেই গেয়েছেন)
২। দুটি পাখি একটি নীড় একটি নদীর দুটি তীর(কণ্ঠ-মোঃ আলী সিদ্দিকী
ও ফরিদা ইয়াসমিন,কথা সিরাজুল ইসলাম)
৩।তোমার দু হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম(কথা-সিরাজুল ইসলাম,কণ্ঠ-মোঃ
খুরশীদ আলম)
উপরিল্লিখিত গানগুলো প্রথম থেকেই শ্রোতারা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে ।
রেডিওতে জেব-উন-নেসা জামালের লেখা ৮০ ভাগ গানের সুরকার আজাদ রহমান
। জেব-উন-নেসা জামাল-আজাদ রহমান-মোঃ খুরশীদ আলম কম্বিনেশনের নিচের গানগুলো উচ্চ
মাত্রার তাল, লয়,অর্কেস্ট্রেশন,কম্পোজিশন
ও প্রেজেন্টেশনে তুমুল শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করেঃ
১। আলতো পায়ে ছন্দ তুলে সাঁঝের বেলা গায়ের কুলে কোন সে বধূ যায়
২। চঞ্চল দু নয়নে বলোনা কি খুঁজছ
৩। ঝলক দেয়া কাঁকন পরে এসোনা আর
৪। পরেছ মন্দির চরণে,এঁকেছ অঞ্জন নয়নে
ডাঃ আবু হায়দার সাজেদুর রহমানের সাথেও আজাদ রহমানের রসায়নটাও ছিল
উল্লেখযোগ্য । নিচের গানগুলো আজো শ্রোতার হৃদয়ে ঢেউ তুলে যায়ঃ
১। এই চোখেতে কাজল আর আঁকবো না(জীনাত রেহানা)
২।প্রেমেরও পরাগ মেখেছ বলে সুন্দর তুমি তাই(বশির আহমেদ)
৩। ওগো চল চল আজ এই ধূপছায়া সন্ধ্যায়(সাবিনা ইয়াসমিন)
আরো অসংখ্য রেডিওর বেসিক গান আজাদ রহমানের সাবলীল সুরের ব্যঞ্জনায়
চির অমলিন। নিচের গানগুলো উল্লেখ না করলেই নয়ঃ
১।আমায় কেন মুক্তো হতে বল (কথা-আল কামাল আঃ ওহাব,কণ্ঠ-শাহনাজ
রহমতুল্লাহ)
২।কেন আঁখি হলো ছলছল কেন মুখে কথা নেই(কথা-মোস্তাফিজুর রহমান,কণ্ঠ-মাহমুদুন্নবী)
৩। ও নয়ন পাখিরে তোরে কোথায় বেঁধে রাখিরে( কথা-আলিমুজ্জামান,
কণ্ঠ-সাবিনা ইয়াসমিন)
৪। আর নেম না অথই জলে সই(কথা-আলিমুজ্জামান,কণ্ঠ-শাহনাজ
রহমতুল্লাহ)
৫।এই জীবনের মঞ্চে মোরা কেউবা কাঁদি কেউবা হাসি(কথা-হেমায়েত হোসেন,
কণ্ঠ-শাহনাজ রহমতুল্লাহ)।
আজাদ রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় প্রথম ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৯ সালে
বাবুল চৌধুরী পরিচালিত আগন্তুক । এ ছবিতে ২২ বছর বয়সী মোঃ খুরশীদ আলমের সিরিয়াস
প্রজেন্টেশন ‘ বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’ সঙ্গীত
বোদ্ধাদের চমকে দেয় । এ ছবিতে শাহনাজ রহমতুল্লাহ ‘ আমি
যে কেবল বলেই চলি তুমিতো কিছুই বল না’’স্থায়ী ও ২ অন্তরার মোহনীয়
আবেশের পর শেষ দু লাইনে মাহমুদুন্নবী ঢেলে দেন তাঁর চিরাচরিত আবেগ ‘ কেমনে
কেমনে বোঝাব বলো তুমি যে আমার কত আপনার’ পুরো
গানটা যেন আধো তন্দ্রা আধো জাগরণের এক অপরুপ আচ্ছন্নতা । অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন
রাতের পর দিন ছবিতে আহমদ জামান চৌধুরী রচিত আজাদ রহমান সুরারোপিত হেমন্ত
মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া টাইটেল সঙ(সাবিনা ইয়াসমিনও গেয়েছেন ছবির মাঝামঝি অংশে) “
কাঁদিস না রে দুঃখ ঘুচে যাবে” কথা
ও সুরে দুঃখ ও প্রতিবাদের এক অপূর্ব সম্মীলন যেন । মাসুদ পারভেজ, অশোক
ঘোষ, মোহসিন ও কাজী হায়াতের বেশির ভাগ ছবির
সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান। প্রিয়তমা, মাসুদ
রানা,এপার ওপার,মাস্তান,
মায়ার বাঁধন, বাদী থেকে বেগম, অনন্ত
প্রেম(১টি গান ছাড়া), দস্যু বনহুর,আগুন,গোপন
কথা, আয়না, মতিমহল,
যাদুর বাঁশী,নওজোয়ান,পাগলা
রাজা,ডুমুরের ফুল,দি
ফাদার,মৌচোর, গুনাহগার,চাঁদাবাজ
সহ প্রায় দুইশত ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আজাদ রহমান । আজাদ রহমানের স্বকণ্ঠে
গীত অবিস্মরণীয় গানগুলো হলোঃ
১। ভালবাসার মূল্য কত(এপার ওপার)
২। ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়(দস্যু বনহুর)
৩।কর মনে ভক্তি মায়ের থাকতে হাতে দিন( ডুমুরের ফুল)
৪। লোকে আমায় কয় গুনাহগার(গুনাহগার)
আজাদ রহমান সুরারোপিত বহু কালজয়ী গানের মধ্যে আছেঃ
১। মনেরও রঙে রাঙাবো(মাসুদ রানা ছবিতে সেলিনা আজাদ)
২।অলিরা গুণগুন গুণগুণ গুণ গুণিয়ে(শাহনাজ রহমতুল্লাহ, আগন্তুক)
৩। কচি ডাবের পানি(সাবিনা ইয়াসমিন,খুরশীদ
আলম, রাতের পর দিন)
৪। তোমার নামে শপথ নিলাম(খুরশীদ আলম, মায়ার
বাঁধন)
৫। বন্ধু ওগো কি করে ভাবলে(সাবিনা ইয়াসমিন, এপার
ওপার)
৬। মন রেখেছি আমি তার মনেরও আঙ্গিনায়(আঃ জব্বার,এপার
ওপার)
৭। এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি(মোঃ আঃ জব্বার,মাস্তান)
৮। আকাশ বিনা চাঁদ বাঁচিতে পারে না(রুনা লায়লা, যাদুর
বাঁশী)
৯। মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না( রুনা লায়লা, আগুন)
১০। বখশিশ না চাই রে এই ইনাম আমি চাইরে(মোঃ খুরশীদ আলম, মতিমহল)
১১। সোনা দোলে যাদু দোলে(সেলিনা আজাদ, খোকন
সোনা)
১২। তুমি হলে তুমি দূর এলো কাছে( সেলিনা আজাদ, দস্যু
বনহুর)
ফিল্মের গানে সুরের ভ্যারিয়েশন, এক্সপেরিমেন্টাল
অ্যাপ্রোচ, উপস্থাপনার অনন্যতায় নিচের দুটি গান উল্লেখ
না করলেই নয়ঃ
১। আমাকে মাফ করে দে আমি আর মদ খাবো না( খন্দকার ফারুক আহমেদ,
খোকন সোনা)
২। আমি কি গাইবে গান চারিদিকে ব্রেন গান,স্টেন
গান, মেশিন গান(মোঃ খুরশীদ আলম, দি
ফাদার)
আজাদ রহমান সুরারোপিত ছায়াছবির কিছু অসাধারণ ডুয়েটঃ
১। প্রেম যদি লুকিয়ে রাখো(এম,এ
হামিদ ও সেলিনা আজাদ, মায়ার বাঁধন)
২। ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি(মোঃ খুরশীদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিন,
অনন্ত প্রেম)
৩। ওই মধু চাঁদ আর এই জ্যোছনা(রুনা লায়লা ও মাহমুদুন্নবী, দি
ফাদার)
৪। তোমার চিঠি পেলাম আমি(সাবিনা ইয়াসমিন ও মোঃ আলী সিদ্দিকী,
মায়ার বাঁধন)
আজাদ রহমান সুরারোপিত কিছু দেশাত্মবোধক গানঃ
১। জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো
২।সংগ্রাম সংগ্রাম চলবে চলবে
৩। পূবের আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়
৪। মুক্তিযোদ্ধা কোথায় তুমি
আজাদ রহমান চাঁদাবাজ ছবির সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে জাতীয়
চলচ্চিত্র পুরষ্কার জিতেছিলেন । সত্তুরের দশকের শেষে স্বাস্থ্য সচেতনা মূলক একটি
চলচ্চিত্র” গোপন কথা”মুক্তি
পায় আজাদ রহমানের পরিচালনায় ।“ মনেরও রঙে রাঙাবো”,”
লোকে আমায় কয় গুনাহগার” সহ
আরো কিছু বহুল জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি নিজেই ।
আজাদ রহমান ছিলেন বাংলা গানের স্বতন্ত্র সত্তা নির্মাণের সম্মুখ
সারির কারিগর, টিউন অ্যানালাইজিং এর স্কিল্ড পারফরমার,
সর্বোপরী ইউনিফরম অর্কেস্ট্রেশনের ইনোভেটিভ গাইড ।
গানের প্রতিটি শাখায় তিনি রেখে গেছেন আজন্ম লালিত ধ্রুপদী ছোঁয়া ।
একজন আজাদ রহমানের শূন্যতা বাংলা গানের ভুবনে আরো বহুযুগ পরেও গভীরভাবে অনুভুত হবে
।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন