শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

গান শুধু গান নয়

 

শাহনাজ রহমতুল্লাহ  বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ টি বাংলা গানের মাঝে তার গাওয়া গান চারটি


গানের শুধু স্থায়ী, ১টি অন্তরা, সঞ্চারী অথবা ছোট্ট একটি লাইন, জীবন, মৃত্যু, দুঃ খ, হতাশা, আনন্দ, বেদনা, উচ্ছাস,প্রেম, বিদায়, অনুভব, অনুরাগ, অভিমানকে এত গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারে সাহিত্য সাংস্কৃতির আর কোনো মাধ্যম তা পারে কিনা তা আমার সন্দেহ আছে। তাই, গান আমার কাছে শুধু গানই নয়, অন্য কিছু। আমি প্রধানত গানের পুরো লিরিক্স ফলো করতে করতে হঠাত আটকে যাই, চোখ বুজে ফেলি, হারিয়ে যাই, যেমন আঞ্জুমান আরা বেগম ও আঃ জব্বারের একটি ডুয়েটে হঠাত যখন আঃ জব্বার গেয়ে উঠলেনঃ

"সব চাওয়া মুছে যায় চোখের জলে

এরেই কি নিদারুন ভাগ্য বলে"

২য় বার একই কথাকে প্রশ্ন আকারে বলা হয়। আমি চমকে যাই। কী বললেন গীতিকার, স্বীকার করতে যদি কষ্টও হয় কীভাবে অস্বীকার করি যে সব সংগ্রাম, স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা একদিন চোখের জলে ভেসে যায়?

একই গানে পরের কথাগুলো প্রথাবিরোধী, তবে কে কে অস্বীকার করতে পারেন যে এই ভাবনাটা আপনার মনে দু একবারও খেলা করেনি?

"এত যদি বঞ্চনা, কেন মিছে আরাধনা

নিয়তির এ খেলার শেষ যে কোথায়"

গানের কথাগুলো লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর সত্য সাহার।

ডঃ মোঃ মনিরুজ্জামানের কথায় সত্য সাহার সুরে আঃ জব্বারের গাওয়া আরেকটি গানের স্থায়ীটা এরকম,

" আকাশ ভেঙে যদি আসে ঝড় জানে তা সবাই পৃথিবীতে

হৃদয় ভেঙে চৌচির হয়ে, রয়ে গেল নিভৃতে

জানলো না কেউ পৃথিবীতে "

ঝড়ের আওয়াজ, বজ্রপাতের শব্দ খুব তীব্র, কিন্তু তীব্রতর হলো হৃদয় ভাঙার শব্দ। খুব কাছে থেকেও কি কেউ শুনেছেন হৃদয় ভাঙার শব্দ?

গাজী মাজহারুল আনোয়ার এর লেখা রাজা হোসেন খানের সুরে আঃ জব্বার গীত আরেকটি গানের অন্তরার একটি লাইনঃ

" কোথায় চলার শেষ কত দূরে

ক্লান্ত চরণ শুধু প্রশ্ন করে"

আঃ জব্বার


ইতোমধ্যেই অনেকেই চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের চরণ/ মনন কি এই প্রশ্ন করছে না আর কতদিন চলতে হবে? থেমে গেলেই কি একটু স্বস্তি আসবে?

সব মানুষের একটি ডাক নাম থাকে। অথবা কেউ একজন আপনাকে একটি নির্দিষ্ট নামে ডাকতো।

জীবনের বহু পথ পাড়ি দেবার পথে কেউ সেই নাম ধরে ডাকেনি। জীবনের মধ্যাহ্নে অথবা গোধুলিতে যদি প্রিয় সেই কণ্ঠে অথবা কোনো স্মৃতিময় লগনে হঠাত সে নামে কেউ ডেকে উঠে, কেমন লাগবে? মুকুল দত্তের লেখায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে তালাত মাহমুদ যেন সেই কথাটিই বলছেনঃ

" ভুলে যাওয়া নাম ধরে

ডাক দিলে কেন

ব্যথা হয়ে চিরদিন

রয়ে গেল যেন"

 

আজ থেকে ৩৭ বছর আগে গীতিকবি মাসুদ করিম লিখেছিলেন গানটি, সুবল দাসের সুরে গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আঃ হাদী। শেষ অন্তরায় সাবিনা ইয়াসমিন মানুষের অসহায়ত্বের স্বীকারোক্তিটা আল্লাহর কাছে দিয়েছিলেন এভাবেঃ

" সবার সেরা সৃষ্টি মানুষ তোমার দুনিয়ায়

আজ বড়ই অসহায়

কেউ রোগে শোকে কেউ বিপথে

ধুকে ধুকে মরে হায়

খোদা আশা নিরাশায়"

রোমান্টিক ও ঘুমপাড়ানী গানে বিশেষ পারদর্শী গায়িকা আঞ্জুমান আরা বেগম


অনুশোচনার গভীরতা কত গভীর দেখেছেন? কেউ বলবেন আজকের বাস্তবতার সাথে গানের বাণীটা কতটা সংগতিপূর্ণ? গানটা শেষ হয় এভাবেঃ

" তুমি হাসাও তুমি কাঁদাও সবই তোমার শান

দুঃখ যত এই গরীবের কর অবসান"

আরো আগে আঃ জব্বারের কণ্ঠে গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও সত্য সাহা তুলে দিয়েছিলেন যে গান তার শেষ অন্তরায় মানুষ আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এভাবেঃ

তুমি মাওলা দয়ার সাগর

তুমি অন্তর্যামী

তুমি লালক, তুমি পালক

বিচার দিনের স্বামী

তোমার দয়ার পিয়াসি আমি

দাও পথের দিদার, হে পারওয়ারদেগার

আমি শ্রদ্ধেয় শিল্পী সৈয়দ আঃ হাদী ভাইয়ের সাথে একদিন ফোনালাপে বললাম," আপনি ৫ বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু ১৯৭০ সালে যোগবিয়োগ ছবির জন্য রেকর্ডকৃত ডঃ আবু হেনা মুস্তাফা কালের লেখা ও সুবল দাসের সুর করা আপনার সেই গানটিকে কিন্তু কোনো গানই অতিক্রম করতে পারেনি। পারবে কীভাবে? জীবনের গভীর সত্যকে যে প্রকাশ করেছে সে গান, এই কথার ভেতরতো ঢুকে যেতে পারে সব কথা, যে কথায় জীবন আর মৃত্যু একসাথে আছেঃ

Razzak n Aazad


" কেউ চলে যায় কেউবা আসে

দুদিনের এই পরবাসে"

তাইতো মানব মনের হাহাকার ফুটে ওঠে এভাবেঃ

" এই যোগবিয়োগের রঙমেলায়

এলাম কেন তবে

বাজলে বাঁশী আবার যদি

ফিরে যেতে হবে"

এই কথা এই গানের প্রাসংগিকতা কি পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইংগিত করেনা? মানুষের মনে এ প্রশ্ন জাগাওতো অস্বাভাবিক নয়, যদি চলেই যেতে হবে তাহলে কেনইবা আমাদের পৃথিবীতে পাঠানো হলো। এই প্রশ্ন থেকে কিন্তু মানুষ অনুসন্ধিৎসু হতে পারে মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহর অভিপ্রায়ের।

মানুষের মনে কিন্তু প্রায়শই," কী পেলাম, কী পেলাম না, কেন এটা পেলাম, কেন ওটা পেলাম না, এই ভাবনাগুলো খেলে যায়" এই পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মুকুল দত্তের লেখায় ও ডাঃ নচিকেতা ঘোষের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে যেন এভাবেই মেলানোর চেষ্টা করা হয়:

"যা কিছু পেয়েছি কাছে তাই সঞ্চয়

যা কিছু পেলাম নাকো সে আমার নয়"

এভাবেই গানের মাধ্যমে অসীমের প্রতি সসীমের আত্মনিবেদন, জীবন, হতাশা, মৃত্যু, হাহাকার যেন প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আধুনিক গানের স্বর্ণালী দিন এর নেপথ্যের কারিগর

  পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাট দশকের সূচনা পর্যন্ত রেডিওর গানগুলোতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল মেলোডির উপস্থাপনা করেন। সুরকার ও গায়ক হিসেবে আব...