শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

আবদুল আলীম

 

মরমী শিল্পী আঃ আলীম

উপ মহাদেশের তাবৎ সঙ্গীতবোদ্ধারা স্বীকার করে নিয়েছিলেন ---- আঃ আলীমের মত কন্ঠ ঐশ্বর্য্য নিয়ে আর কোন সঙ্গীত শিল্পী গানের ভুবনে আসেননি । সহজাত কন্ঠ মাধূর্যের সাথে শাস্ত্রীয় চর্চ্চার মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা লোক সঙ্গীতকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায় । বাংলার নদী, নৌকা,মাটি,মাঠ ঘাটের অতি আপন কন্ঠ আঃ আলীম । পল্লীগীতি,মুর্শিদী,ভাটিয়ালী,ভাওয়াইয়া,আধ্যাত্মিক গানের সুবিশাল ভুবনে আঃ আলীম বিচরন করেছেন সম্রাটের মত । বাঙালির লোকজ পরিচয় ফুটে ওঠে আঃ আলীমের গানে।


১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই আঃ আলীমের জন্ম ভারতের মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে । ছোটকালে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শুনে শুনে গায়ক হওয়ার স্বপ্ন মনে উঁকি দেয় । ছোটবেলায় বিভিন্ন পাবনে গান গেয়ে স্থানীয় জনতার অকুন্ঠ প্রশংসা অর্জন করেন । ১৯৪৪ সালে মাত্র তের বছর বয়সে তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড বের হয় ।কলকাতায় থাকাকালীন তিনি কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাস উদ্দিন আহমেদের সংস্পর্শে আসেন। সেখানে তাঁর প্রথম ওস্তাদ ছিলেন সৈয়দ গোলাম আলী। তিনি লোক ও শাস্ত্রীয় সঙ্গিতের তালিম নিয়েছিলেন বেদার উদ্দিন আহমেদ, আঃ লতিফ, আঃ হালিম চৌধুরী, মোঃ খসরু ও মমতাজ আলী খাঁনের কাছ থেকে । দেশ বিভাগের পর তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন । ১৯৫৪ সালে নাজিম উদ্দিন রোডের রেডিয়ো স্টেশানে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে গান গাওয়া শুরু করেন । ১৯৫৬ সালে দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশে প্লেব্যাক করেন আঃ আলীম । ১৯৬৪ সালে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই টিভির একজন জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন । মুখ ও মুখোশ, সুতরাং, জোয়ার এলো,কাগজের নৌকা, সাত ভাই চম্পা, অবাঞ্চিত, এতটুকু আশা, নিশি হলো ভোর, বেদের মেয়ে,পরশ মনি নবাব সিরাজউদ্দৌলা, আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী, লালন ফকির, সুজন সখী সহ প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন আঃ আলীম। আম জনতার এমনি এক প্রিয় শিল্পী ছিলেন আঃ আলীম যে তারা যদি খবর পেত আঃ আলীম অমুক ট্রেনে আসছেন তাহলে স্টেশানে স্টেশানে ট্রেন থামিয়ে দেয়া হতো । বাংলাদেশের যে প্রান্তেই গিয়েছেন, আবালবৃদ্ধবণিতা তাদের হৃদয়ের সব ভালবাসা দিয়ে তাকে বরণ করে নিত । বিধাতা প্রদত্ত এক আশ্চর্য কন্ঠসুধার অধিকারী আঃ আলীম আধ্যাত্মিক গানেও দেখিয়েছেন অসামান্য দক্ষতা। গান পরিবেশনায় ছিল একাগ্রতা ও স্বতস্ফূর্ততা । সুরের ভুবনে আঃ আলীম নিজেকে উজার করে দিয়েছেন । নিজস্ব মাটির সোঁদা ঘ্রাণ এমন করে আর কেউ কন্ঠে ধারন করতে পারেননি । আনুমানিক ১২০০ গান রেকর্ড করেছেন আঃ আলীম যার প্রায় প্রতিটিই পেয়েছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা । তাঁর গাওয়া সমৃদ্ধ গানের ভাণ্ডারে আছেঃ

১। নাইয়া রে নায়ের বাদাম তুইলা

২। রুপালী নদী রে রুপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল

৩। হলুদিয়া পাখি সোনারই বরন

৪। দোল দোল দোলনি

৫। দুয়ারে আইসাছে পালকি

৬। দুঃখ সুখের দোলায় দোলে

৭। কেহই করে বেচা কেনা কেহই কান্দে

৮। বানিজ্যের নামেতে আমি এলাম এ কোন ঘাটে

৯। সর্বনাশা পদ্না নদী

১০। মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়

১১। এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া

১২। বন্ধুর বাড়ি মধুপুর আমার বাড়ি অনেক দূর

১৩। পিঞ্জিরার পাখির মত আমি তারে উইড়া যাইয়া দেখি

১৪। ও আমার পঙ্খীরাজ রে

১৫। আমার প্রাণের প্রাণ পাখি আমার হিরামন পাখি

১৬। মন পাখি তুই আর কতকাল থাকবি খাঁচাতে

১৭।কলকল ছলছল নদী করে টলমল

১৮। শোন গো রুপসী কন্যা লো

১৯। সে পারে তোর বসত বাড়ি রে

২০। ঘাটে পার ঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া

২১। আমারে সাজাইয়া দিও নওশারও সাজন

২২। মাঝি বাইয়া যাও রে

২৩। মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে

২৪। পরের জাগা পরের জমিন

তিনি জোয়ার এলো ও নবাব সিরাজ উদ্দৌলার উর্দু ভার্সান সহ বেশ কিছু উর্দু ছবিতেও প্লেব্যাক করেন । আজো বাঙালি মুসলমানদের সেহরীর ঘুম ভাঙে আঃ আলীমের গাওয়া হামদ আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালুহুশুনে । আঃ আলীমের সঙ্গিত পরিবেশনা ছিল     “ Plain flow of tune, natural, spontaneous and surprisingly smooth। তাঁর কন্ঠের শিল্পীত দক্ষতার আবেদন ছিল সর্বব্যাপী । জাতির দূর্ভাগ্য ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে এ নশ্বর ভুবনের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান আঃ আলীম । তাঁর ৭ সন্তানের মধ্যে জহির আলীম, আজগর আলীম ও আসিয়া আলীম তাদের পিতার স্মৃতি ও উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন । ১৯৭৭ সালে শিল্পী আঃ আলীমকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয় ।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আধুনিক গানের স্বর্ণালী দিন এর নেপথ্যের কারিগর

  পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাট দশকের সূচনা পর্যন্ত রেডিওর গানগুলোতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল মেলোডির উপস্থাপনা করেন। সুরকার ও গায়ক হিসেবে আব...